দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় বরখাস্ত হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রেস সচিব কেটি জাকারিয়া। শুক্রবারই হোয়াইট হাউস ছাড়ার কথা নিশ্চিত করেন তিনি। প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে একের পর এক বিতর্ক, আইনজীবী হিসেবে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য অসন্তোষ—সব মিলিয়ে কার্যত শুরুতেই শেষ হয়ে গেল জাকারিয়ার ইনিংস।
শুক্রবার সন্ধ্যায় সমাজমাধ্যমে নিজের বিদায়ের কথা জানিয়ে ট্রাম্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন জাকারিয়া। লেখেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন দয়ালু, চমৎকার, অমায়িক, বিবেচক, উৎসাহী এবং পরিশ্রমী মানুষ। আরও বেশি আমেরিকান যদি তাঁকে যথাযথ মর্যাদা দিতেন, তা হলে ভাল হত।” তাঁর দাবি, ট্রাম্প যেভাবে আমেরিকাকে মহান করেছেন এবং করে চলেছেন, তা আর কেউ কখনও করতে পারবেন না। প্রেসিডেন্টের হয়ে কাজ করার সুযোগকে সম্মানের বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে পরিচিতি থাকলেও হোয়াইট হাউসের প্রধান মুখপাত্র হওয়ার আগে জাকারিয়া ছিলেন তুলনামূলক ভাবে স্বল্পপরিচিত। গত মঙ্গলবার তাঁর প্রথম সাংবাদিক বৈঠকই কার্যত বিতর্কের সূত্রপাত করে। মাত্র ১৪ মিনিটের সেই প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনটি সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিয়েই তিনি মঞ্চ ছেড়ে চলে যান। তাতে হতবাক হয়ে যান হোয়াইট হাউসের সাংবাদিকেরা।
শুধু তাই নয়, লিখিত বক্তব্য পড়ার সময় বারবার হোঁচট খাওয়ার পাশাপাশি এক পর্যায়ে নিজের স্বামীকেই ‘প্রেসিডেন্ট’ বলে উল্লেখ করেন জাকারিয়া। বৈঠকের পর থেকেই তাঁর পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে শুরু হয় জোর চর্চা। বিশেষ করে, তিনি আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আইনজীবী পরিচয়েই বিপত্তি
ক্যালিফোর্নিয়ার পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক জাকারিয়া একাধিকবার নিজেকে ‘লইয়ার’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু পরে স্বীকার করেন, আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি পেতে প্রয়োজনীয় বার পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হননি। একবার পরীক্ষায় বসেও অকৃতকার্য হয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
জাকারিয়ার যুক্তি, ‘লইয়ার’ এবং ‘অ্যাটর্নি’ শব্দ দু’টির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, আইন পেশায় কাজ করার অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই ‘অ্যাটর্নি’ পরিচয়টি প্রযোজ্য। কিন্তু বিতর্ক আরও বাড়ে যখন সামনে আসে, এর আগে সমাজমাধ্যমে তাঁকে ‘অ্যাটর্নি’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। হোয়াইট হাউসও তাঁর নিয়োগের কথা ঘোষণা করার সময় একই পরিচয় ব্যবহার করেছিল।
প্রথম সাংবাদিক বৈঠকের পরবর্তী কয়েক দিন নিজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতেই ব্যস্ত থাকতে হয় জাকারিয়াকে। বোঝানোর চেষ্টা করেন, প্রেসিডেন্টের প্রধান মুখপাত্রের দায়িত্ব সামলানোর জন্য তিনি প্রস্তুত।
প্রশ্নবাণে বিদ্ধ জাকারিয়া
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ফক্স নিউজের সঞ্চালক শন হ্যানিটির সাক্ষাৎকারে ফের অস্বস্তিতে পড়েন জাকারিয়া। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হ্যানিটি তাঁর প্রথম সাংবাদিক বৈঠক নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেন, “কী হয়েছিল?”
জাকারিয়ার ব্যাখ্যা, চাকরির প্রস্তাব গ্রহণ থেকে প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে হাজির হওয়া—পুরো প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতির জন্য তিনি খুব বেশি সময় পাননি। যে তিনটি সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেল সম্পর্কে তাঁর দাবি ছিল, সেটি রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিত নয়।
নিজেকে ‘লইয়ার’ বলে পরিচয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও হ্যানিটির প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। সঞ্চালকের বক্তব্য, ‘লইয়ার’ আর ‘অ্যাটর্নি’র মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে এত দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন কী? কারণ, অধিকাংশ মানুষই এই দুই পরিচয়ের মধ্যে বিশেষ কোনও ফারাক দেখেন না।
শুক্রবার ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানেও একই প্রসঙ্গ ওঠে। সঞ্চালক লরেন্স জোন্স বলেন, “কেটি, আপনার জন্য সপ্তাহটা কঠিন গিয়েছে। প্রেস সচিবের কাজ সহজ নয়। আর আপনি কখনওই চাইবেন না যে, আপনি নিজেই খবর হয়ে উঠুন।”
এর পরেই জোন্স জানতে চান, প্রেসিডেন্টের আস্থা এখনও তাঁর উপর রয়েছে কি না।
“আমি তো এখানেই দাঁড়িয়ে আছি,” উত্তর দিয়েছিলেন জাকারিয়া। হোয়াইট হাউসের উত্তর দিকের লন থেকে কথা বলছিলেন বলেই সম্ভবত এই উত্তর। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, তাঁর আশা, চারপাশের প্রত্যেকের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন। তবে পরবর্তী সাংবাদিক বৈঠক কবে করবেন, তা জানাতে পারেননি।
শেষ ইঙ্গিত ট্রাম্পের মুখেই
জাকারিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা অবশ্য শুক্রবারই নতুন মাত্রা পায়। সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প নিজেই ইঙ্গিত দেন, এই পদে জাকারিয়ার মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। বিতর্কে জর্জরিত প্রেস সচিবকে চাকরিতে থাকা নিয়ে ‘আবার ভেবে দেখতে’ বলেছিলেন বলে জানান তিনি।
হোয়াইট হাউসের বাইরে ট্রাম্প বলেন, “আমি বলেছিলাম, ‘কেটি, এই কাজ কি তোমার জন্য? কারণ সত্যি বলতে, তোমার তো এর কোনও প্রয়োজন নেই।’ আমি ওকে বলেছিলাম, ‘সত্যি বলছি, আমি তোমার জায়গায় থাকলে আবার ভেবে দেখতাম। তুমি ভেবে দেখো, তবে আমি হলে পুনর্বিবেচনা করতাম।’”
তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিদায়ের কথা নিশ্চিত করেন জাকারিয়া। আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একাধিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এই ঘটনা নতুন অস্বস্তি তৈরি করল। আর হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব হিসেবে জাকারিয়ার পাঁচ দিনের মেয়াদ মনে করিয়ে দিল, ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিন্দে কখনও কখনও পদে বসার চেয়েও টিকে থাকা কঠিন।